বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিকভাবে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা ও নৃশংস নির্যাতনের ঘটনায় সাংবিধানিক অধিকারের ভিত্তিতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন গ্লোবাল বেঙ্গলী হিন্দু প্লাটফর্ম বাংলাদেশ অধ্যায়ের নেতৃবৃন্দ। গতকাল বুধবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন ও প্রধান উপদেষ্টা বরাবরে স্মারক লিপি প্রদান কর্মসূচিতে এই দাবি করা হয়।
মানববন্ধন কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, মনিন্দ্র কুমার নাথ, জয়ন্ত দেব, প্রদীপ কুমার আচার্য, অশোকতরু সাহা, এডভোকেট জে,কে,পাল, ডাঃ বিমলা প্রসাদ, এডভোকেট জীতেন্দ্র চন্দ্র বর্মন, অনিল পাল, এডভোকেট সুমন রায়, সাংবাদিক শ্যামল কান্তি নাগ ও শিমুল সাহা, এডভোকেট সন্তোষ দাস, শান্ত কুমার সাহা, পলাশ কান্তি দে, এডভোকেট পলাশ, পলাশ কুমার দাস, রজৎ শুভ্র বিশ্বাস, অমিত ভৌমিক, উদয় রায়, লিমন দাস প্রমুখ।
মানববন্ধন কর্মসূচিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিকভাবে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা, আগুন দেওয়া, বসতবাড়ি দখল, লুটপাট ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অমানবিক নৃশসং ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রেই বিচার হচ্ছে না। অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাচ্ছে না -যা অপরাধীদের উৎসাহিত করছে। এসব ঘটনা সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, এখানে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তব চিত্র আমাদের গভীরভাবে আশাহত করছে এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করছে। আমরা হিন্দুদের ওপর সংগঠিত হওয়া প্রতিটি নির্মম ঘটনার আইনানুগ বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই ।
গত ১৯ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংস প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশে গত এক বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংগঠিত অত্যাচার নির্যাতনের মোট ৬৪৫টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭১টি ঘটনায় ‘সাম্প্রদায়িক উপাদান’ পেয়েছে পুলিশ। আমাদের দাবি, সরকারি হিসেবের বাইরে আরো শতশত নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে এসব ঘটনার বিচার করতে হবে। বিচার করা এখন সরকারের দায়বদ্ধতা। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল,ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (ইউএসসিআইআরএফ) মনে করে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার প্রতিশ্রুত মানবাধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে এবং তাতে মব সহিংসতার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অধিকার লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে, ২৭ জন সংখ্যালঘু নিহত, ২০টি ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার ঘটনা, ৫৯টি ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা হয় এবং ১৫৭টি হিন্দু পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসের ১০ তারিখ থেকে চলতি জানুয়ারি মাসের এই সময় পর্যন্ত বিভৎস নৃশংস ১০ টি হত্যাকান্ড ঘটেছে। যা সারা পৃথিবীর হিন্দুদের বিচলিত করে তুলেছে। সেই হত্যাকান্ডের তালিকায় রয়েছে, গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকায় গার্মেন্টস কর্মী দিপু দাসকে প্রথমে পিটিয়ে আধামরা করে তারপর তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, গত ২৫ ডিসেম্বর রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় অমৃত মণ্ডল ওরফে সম্রাট (২৯) নামের এক যুবককে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা। ২৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় একজন আনসার সদস্য বজেন্দ্র বিশ্বাসক’কে (৪০) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা। ৫ জানুয়ারি যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক ব্যবসায়ীকে মাথায় সাত রাউন্ড গুলি করে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। ৫ জানুয়ারি নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় সুলতানপুরে শরৎ চক্রবর্তী ওরফে মণি (৪০) নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৬ জানুয়ারি নওগাঁ জেলায় মিঠুন সরকার (২৫) নামে এক হিন্দু যুবকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ৭ জানুয়ারি শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাস নামে একজন ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। ৯ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে জয় মহাপাত্র নামে এক যুবককে একটি দোকানে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে তার মুখে বিষ ঢেলে দেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ১৭ জানুয়ারি রাজবাড়িতে রিপন সাহা নামে একজন পেট্রোল পাম্পের কর্মচারীকে গাড়ি দিয়ে পিষে মারা হয়েছে। ১৮ জানুয়ারি গাজীপুরের কালীগঞ্জের মিষ্টি ব্যবসায়ী লিটন দাসকে দোকানের মধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া হবিগঞ্জে কলেজ ছাত্রী মনপ্রিয়া সরকারকে অপহরণ করে হয়েছে। তার আর খোঁজ মেলেনি। কুমিল্লায় ঘরে ঢুকে হিন্দু নারীকে উলঙ্গ করে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো হয়েছে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক গণহত্যা ও নির্যাতন।
হিন্দু নেতৃবৃন্দ বলেছেন, এই মুহুর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সনাতন হিন্দুরা ধর্ম অবমাননার নামে ব্যাপকভাবে সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হচ্ছেন। খুন ধর্ষণ লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতনের কারণে ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন সনাতন হিন্দুরা। আমরা কোনো ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করার পক্ষে নই। আমাদের দাবি, সনাতন হিন্দুদের ওপর যে সহিংস ঘটনাগুলো হচ্ছে সেই ঘটনাগুলো সাংবিধানিক অধিকারের ভিত্তিতে, আইন অনুযায়ী বিচার হোক। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মনে আস্থা পুন:প্রতিষ্ঠায় গ্লোবাল বাঙ্গালী হিন্দু প্লাটফর্মের নেতৃবৃন্দ নিম্নক্তো দাবিগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরেছেন। ১.সংখ্যালঘু সনাতন হিন্দুদের ওপর সংঘটিত সকল নির্যাতন, খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। হিন্দুদের জন্য আলাদাভাবেই দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল গঠন এবং জুডিশিয়াল তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২. সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় স্থায়ী ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সনাতন সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় স্থায়ী সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করতে হবে। জোরপূর্বক চাকুরীচ্যুত হিন্দুদের চাকুরিতে পুনর্বহাল করতে হবে। দেশের সকল হিন্দুদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। হিন্দুদের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে। নেতৃবৃন্দ আশা করেন উপরোক্ত দাবিগুলো পূরণ হলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের আস্থার সংকট দূরীভূত হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ধর্মীয় স্থাপনায় নৃশংস হামলা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি
- আপলোড সময় : ২২-০১-২০২৬ ১২:২০:৪১ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-০১-২০২৬ ১২:২০:৪১ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
স্টাফ রিপোর্টার